সুদের বিষাক্ত ছোবলের মুখে বর্তমান সমাজ। কায়সার আহমাদ।
সুদ ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা
অর্থনীতির পরিভাষায় সুদ হলো অর্থ বা সম্পদ ধার নেয়ার জন্য প্রদান করা "ভাড়া"। আরবী রিবা শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো বৃদ্ধি,অতিরিক্ত, প্রবৃদ্ধি ইত্যাদি। পণ্য বা অর্থের বিনিময়ে প্রদেয় অতিরিক্ত পণ্য বা অর্থই হলো রিবা অর্থাৎ সুদ।
সুদ সাধারণত দুই প্রকার –
১. রিবা আল-নাসিয়া- এর মানে সময়ের বিনিময়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, জনাব ‘ক’ ১ বছরের জন্য জনাব ‘খ’-কে ১০০ টাকা ঋণ দিল এই শর্তে যে তাকে ১০০ টাকার সাথে অতিরিক্ত আরও ১০ টাকা দিতে হবে। এই অতিরিক্ত ১০ টাকা হলো রিবা আল-নাসিয়া।
২. রিবা আল-ফদল- এর উদ্ভব হয় পণ্যসামগ্রী হাতে হাতে বিনিময়ের সময়ে। একই জাতীয় পণ্যের কম পরিমাণের সাথে বেশি পরিমান পণ্য হাতে হাতে বিনিময় করা হলে পণ্যটির অতিরিক্ত পরিমানকে বলা হয় রিবা আল ফদল।
রিবা আল নাসিয়া হল মূলত বর্তমান সমাজে বহুল প্রচলিত সুদ। পুরো ব্যাংকিং সিস্টেম টিকে আছে এই সুদ ব্যবস্থার উপর। সাধারণ মানুষেরা এ সুদেই ঋণ দিয়ে থাকে। ব্যাংক স্বল্প হারের সুদে ঋণ নিয়ে অপেক্ষাকৃত অধিক হারের সুদে ঋণ প্রদান করে, এই দুই সুদের হারের পার্থক্য হল ব্যাংকের লাভ বা মুনাফা। তাই অর্থনীতির ভাষায় বলা হয়, ব্যাংক পরের ধনের পোদ্দারি করে। এই সম্পূর্ণ ব্যবস্থাটি হারাম সুদের উপর দাঁড়িয়ে আছে।
পবিত্র কুর’আন এবং হাদিসে সুদ
কোরআনে আল্লাহপাক সুদকে হারাম ঘোষণা করেছেন- "এবং ব্যবসায়কে হালাল করা হলো ও রিবাকে করা হলো হারাম" ( সূরা-বাকারা-২৭৫)
"তোমাদের মধ্যে যারা সুদ খায়, সুদ দেয়, সুদের হিসাব লেখে এবং সুদের সাক্ষ্য দেয় তাদের উপর আল্লাহর লানত এবং এ অপরাধের ক্ষেত্রে সবাই সমান। (সহীহ বূখারী, মুসলিম, তিরমিযী)
হযরত আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেন, “রিবার গুনাহ সত্তর প্রকার, তার মধ্যে সবচেয়ে কম ভয়ংকরটি হলো একজন লোকের তার আপন মায়ের সাথে ব্যভিচারের সমান।” (ইবনে মাজাহ, আল বাইহাকি)
সুদ ভক্ষণকারী চিরকাল জাহান্নামী
অধিকাংশ মুসলিমকে শুকরের মাংস খেতে বলা হলে যেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে, সুদ খেতে বলা হলে তেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে না। সুদ আজ আম হয়ে গেছে। অনেকে একে গুনাহ মনে করেন না। অনেকে হারামও মনে করেন না। আমি একাউন্টিং ফাইন্যান্সের ছাত্র। আমার ফিল্ডে অনেক ছাত্র ও শিক্ষককে দেখেছি, তারা সুদকে শুধু জায়েজ না আবশ্যক মনে করেন। বরং তারা বলেন কোনো বেনেফিট/লাভ ছাড়া কারোর টাকা ধার নেয়া অন্যায়। টাকা নিলে তো অবশ্যই বেনেফিট দিতে হবে। এমনকি এক প্রফেসর বললেন- যদি কারোর বেতন বা পেনসান দিতে কিছু বেশি সময় লাগে তবে বেতন দিতে যত দিন বিলম্ব হল তত দিনের সুদ দিতে হবে, যদি সুদ না দেয়া হয় তাহলে তার উপর যুলুম হবে। উল্লেখ্য তিনি নন-প্রাকটিসং মুসলিম নন, তিনি নিয়মিত তাহাজ্জুদ নামাজ আদায়কারী।
যাইহোক, যদি কেউ মদ পান করে, এবং বিশ্বাস করে এটা হারাম। তবে সে একজন কবিরা গুনাহগার, ফাসিক। কিন্তু যদি সে মদ পান করাকে হারাম মনে না করে তবে সে কুফুরি করল। জেনে বুঝে এমন বিশ্বাস রাখলে সে কাফির হয়ে যাবে।
সুদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি এমন। যারা ব্যাংকে জব করেন, বা সুদ গ্রহন করেন বা প্রদান করেন। এদের অধিকাংশের হাবভাব দেখলে মনে হয় না, যে তারা সুদকে গুনাহ মনে করেন। মুখে না বললেও আচরণে একদম বৈধ মনে করেন, এবং এরা বিশ্বাস করেন সুদ ও ব্যবসা তো একই জিনিস। এরা এটা বলে দাবী করতে চান যে, ব্যবসা যেমন সুদও তেমন। অর্থাৎ ব্যবসা যেমন হালাল, সুদও হালাল। এই রকম বিশ্বাস পোষণকারী কাফির, কারণ তারা সুদকে হালাল মনে করে। তাই এরা চিরকাল জাহান্নামী। আল্লাহ ও রাসুল (সা) এদের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। (যদিও যারা সুদ খায় কিন্তু সুদকে হারাম মনে করে তারা কবিরা গুনাহগার)
আল্লাহ পবিত্র কুর'আনে বলেছেন,
"যারা সুদ খায়, তারা কিয়ামতে দন্ডায়মান হবে, যেভাবে দন্ডায়মান হয় ঐ ব্যক্তি, যাকে শয়তান আসর করে মোহাবিষ্ট করে দেয়। তাদের এ অবস্থার কারণ এই যে, তারা বলেছেঃ ক্রয়-বিক্রয় ও তো সুদ নেয়ারই মত! অথচ আল্লাহ তা’আলা ক্রয়-বিক্রয় বৈধ করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন। অতঃপর যার কাছে তার পালনকর্তার পক্ষ থেকে উপদেশ এসেছে এবং সে বিরত হয়েছে, পূর্বে যা হয়ে গেছে, তা তার। তার ব্যাপার আল্লাহর উপর নির্ভরশীল। আর যারা পুনরায় সুদ নেয়, তারাই দোযখে যাবে। তারা সেখানে চিরকাল অবস্থান করবে।" (সূরা বাকারা -২৭৫)
হাদিসে এসেছে এমন যামানা আসবে, যখন মানুষ সকালে মুমিন থাকবে বিকালে কাফির হয়ে যাবে, এবং সন্ধ্যায় মুমিন থাকবে সকালে কাফির হয়ে যাবে। সুদকে বৈধ মনে করে প্রতিদিন অসংখ্য লোক ঈমানহারা হচ্ছে, এবং জাহান্নামে চিরকালের জন্য সুদের টাকায় প্লট বুকিং করছে।
হারাম জড়িত ব্যক্তির দুয়া কবুল হবে না
কেউ হারাম কোনো খাবার খেলে বা কারো খাবার হারাম টাকায় কেনা হলে, পোশাক হারাম বা হারাম টাকায় কেনা হলে আল্লাহ ঐ অবস্থায় তার দুয়া কবুল করেন না। আল্লাহ (মুমিনদেরকে উদ্দেশ্য) করে বলেছেনঃ "হে মুমিনগণ, তোমাদের আমি যেসব পবিত্র বস্তু দিয়েছি তা হতে আহার কর।"
এ কথা বলার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন এক ব্যক্তির কথা বললেন, যে দীর্ঘ সফর করে মাথার চুলগুলোকে এলোমেলো করেছে এবং পদযুগল ধুলায় ধুসরিত করেছে অতঃপর আকাশের দিকে হাত তুলে দুআ করে, হে প্রভু! হে প্রভু! কিন্তু তার খাদ্য হারাম, তার পোশাক হারাম, তার শরীর গঠিত হয়েছে হারাম দিয়ে, কিভাবে তার দুআ কবুল করা হবে?" (সহীহ মুসলিম)
অথচ আজ সমাজে পরিপূর্ণ হালাল খুজে পাওয়া যায় না। মানুষ সুদে জড়িয়ে গেছে, সুদের হারাম টাকা খেতে চিন্তাও করে না। এমনকি ইবাদত করা বা আল্লাহর বিধানের পালনের জন্যও সুদ দেদারসে ব্যবহার করছে। সুদের টাকা মসজিদ মাদরাসায় দিচ্ছে, সুদের টাকায় যাকাত আদায় করছে, হজ্জ ওমরাহ করছে। এই হারাম টাকায় ইবাদাত করা আল্লাহর সাথে মশকরা করার ন্যায়। যদি সুদের টাকায় হজ্জ করা জায়েজ হয় তবে গরু চুরি করে কুরবানী করাও জায়েজ হবে। ব্যাংকে জব আজ সাধারণ বিষয় হয়ে গেছে, অথচ এটা হারাম হারাম হারাম। অনেকে লজিক দেয়, আমি তো নিজের কাজ করে, কষ্ট করে বেতন নিচ্ছি, আরে ভাই চোরও তো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেক কষ্ট করে চুরি করে। তাই বলে কি চুরি বৈধ হয়ে যাবে?
ঘুষ ও সুদ- বর্তমান সমাজের দৃষ্টিভঙ্গী
ইসলামে ঘুষ দেওয়া নেওয়া উভয়ই হারাম। বর্তমান সমাজে ঘুষ বিরোধী মানসিকতা গড়ে উঠেছে এটা অবশ্য ভালো। অভিভাবক, শিক্ষক, প্রশাসন বা প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান সবাই ঘুষ আদান-প্রদানের প্রতি ব্যক্তিগত বা সামাজিক ভাবে নিরুৎসাহিত করছে। ঘুষের ভয়াবহতা বুঝাতে আমরা যেমন সামাজিক ও মানবিক কারন তুলে ধরি ঠিক আরও গুরুত্ব দিয়ে ধর্মীয় কারন উল্লেখ করি। কারোর মনে ভয় জাগাতে শেষ বিচারের কথা মনে করিয়ে দেয়, যে ঘুষ নিলে আল্লাহ অবশ্যই তাকে পাকড়াও করবেন। যদিও সমাজে ঘুষ কমছে না তবুও ঘুষ একটি খারাব জিনিস- কমপক্ষে এই মানসিকতা সবারই গড়ে উঠেছে।
কিন্তু সমাজে আরেকটি বড় অন্যায় ও পাপ রয়েছে তা হল সুদ। ইসলামে সুদ আদান-প্রদান, সুদের হিসাব রক্ষণ এবং সুদের সাক্ষী দেওয়া সবই হারাম। হ্যাঁ ঘুষ একটি কবিরা গুনাহ কিন্তু সুদ ঘুষের চাইতেও বড় কবিরা গুনাহ। নবী করীম (সা) বলেছেন- "সুদের ৭০ টি গুনাহ। তন্নধ্যে সর্বনিম্ন গুনাহটি হলো নিজ মাকে বিয়ে করার পাপের সমান।" ঘুষের প্রতি সমাজের যে মানসিকতা সুদের ক্ষেত্রে ঠিক তার উল্টো। ঘুষের ফলে সমাজ ও মানবতার যে ক্ষতি হয় তার চেয়ে হাজার গুন বেশি ক্ষতি হয় সুদের জন্যে। অন্তর্দৃষ্টির অন্ধ সেকুলার মানসিকতার লোকেরা এটা বুঝবে না। বরং যেখানে তারা ঘুষকে বর্জন করতে উপদেশ দিচ্ছে অন্যদিকে সুদের প্রতি উৎসাহিত করছে। সবাই সুদের জন্য মার্কেটিং করছে, যেন এরা সুদের ফেরিওয়ালা, সুদের দালাল। কেউ সুদের বিরুদ্ধে বললে সমাজে তার নিন্দা করা হয়, কেউ ব্যাংকে জব করতে না চাইলে, তাকে পাগল মনে করা হয়। ঘুষের জন্য যদি আল্লাহর ভয়কে মনে করিয়ে দেয়া হয় তবে সুদের জন্য আরও বেশি করে মনে করিয়ে দিতে হয়।
সমাজে ঘুষ গ্রহীতাকে খুব খারাপ ভাবে দেখা হয় কিন্তু সুদ গ্রহীতাকে খুব সম্মান করা হয়। যার ফিক্সড ডিপোজিট যত বেশি সে তত বেশি সম্মানের পাত্র। শিক্ষকরা ছাত্র-ছাত্রীদের বিশেষ করে বিজিনেস শিক্ষার্থীদের উপদেশ দেন, সরকারি চাকরি করলে ঘুষ থেকে সাবধান থেকো, আর প্রাইভেট চাকরি করতে চাইলে প্রথমেই ব্যাংক জবকে প্রাধান্য দিও। ঘুষের টাকায় বাড়ি গাড়ি হলে তা অন্যায়, আর সুদের টাকায় বাড়ি গাড়ি হলে তা ন্যায় এবং সম্মানের ইনকাম। মানুষ বলে সে তো সরকারি চাকরি করে, অর্থাৎ নতুন কেনা গাড়িটি ঘুষ দিয়ে কিনেছে নিশ্চয়। প্রক্ষান্তরে সুদের মাধ্যমে গাড়ি কিনলে সে ইস্টাব্লিসড ম্যান। ছেলে ঘুষ খায় তার কাছে বিয়ে দেওয়া যাবে না, ব্যাংকে জব আছে এমন ব্যক্তিকেই বিয়ে দিতে হবে। কি নব্য জাহিলিয়াতে আমরা বসবাস করছি। এদের উপর শয়তানের আছর পড়েছে। আল্লাহ পবিত্র কুর'আনে বলেছেন- "যারা সুদ খায় (কিয়ামতের দিন) তারা কেবল সে ব্যক্তির মতো দণ্ডায়মান হয় যাকে শয়তান নিজের স্পর্শ দ্বারা মাতাল বানিয়ে দিয়েছে" (সুরা বাকারা), এই সেকুলার সমাজ নিজ স্বার্থদেখে ইসলামকে ব্যবহার করে।
ঘুষ ও সুদ উভয়টি বর্জনীয়। আল্লাহর রাসুল (সা) ঘুষখোর, ঘুষদাতা (উভয়কেই) অভিশাপ করেছেন। অন্যদিকে আল্লাহ পবিত্র কুর'আনে ইরশাদ করেছেন, "অতঃপর যদি তোমরা (সুদ) পরিত্যাগ না কর, তবে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত হয়ে যাও।" (সুরা বাকারাহ- ২৭৯)
গ্রাম্য সমাজে সুদের ছোবল
বর্তমান সবচেয়ে বেশি জনজমাট নিশ্চিত লাভজনক ব্যবসা! হল সুদের ব্যবসা!। বিশেষ করে গ্রাম্য হত দরিদ্র কৃষক শ্রেণী এই সুদ নামক মহামারীতে বেশি আক্রান্ত। তারা সুদে ধার দেওয়া মহাজনদের দ্বারা জুলুমের শিকার। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আসলের উপর ১০% ধরে সুদ চার্জ করা হয়। হাজারে একশত টাকা। কেউ দুই মাসের জন্য ২৫,০০০/= টাকা ঋণ নিলে তাকে প্রতি মাসে শুধু সুদ দিতে হবে ২,৫০০/= টাকা। এক লক্ষ টাকা ঋণ নিলে মাসে ১০ হাজার টাকা সুদ হবে। ফসল চাষ করার ঋণ নিলে- ফসল বিক্রি করে টাকা পেতে কমপক্ষে ৩/৪ মাস অপেক্ষা করতে হয়। চার মাস শেষে সুদী মহাজনকে দিতে হবে ১ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা। তাহলে নিশ্চিত ভাবে দেনাদারকে ১,৪০,০০০/= টাকা আয় করতে হবে অন্যথায় তাকে জমি বা বাসগৃহ দিয়ে ঋণ আদায় করতে হবে। ফসল উৎপাদন নিশ্চিত বিষয় নয়, এটা আপেক্ষিক। এটা স্পষ্ট জুলুম। অর্থের পোদ্দারি ব্যাংকারও এত সুদ চার্জ করে না। বর্তমান সুদের হার বাৎসরিক ৮-৯% আর এই সব জালিম মহাজনের সুদের হার হল মাসিক ১০%। সুদ সম্পর্কে ইসলামে এমন শাস্তি বর্ণীত হয়েছে যা অন্য কোনো পাপের জন্য হয় নাই। কে পারবে আল্লাহ ও তার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে?
সুদের মোহে অন্ধ সমাজ
সুদ হল বর্তমানে বিশ্বে এক মহাফিতনা। পৃথিবীর ইতিহাসে সুদ কখনো এতটা বিস্তার করে নাই যতটা এখন করেছে। এক সময় খ্রিষ্টান ধর্মে এটা নিষিদ্ধ ছিল তবে যুগের স্বার্থে! কয়েক শতাব্দী পূর্বে তাদের ধর্মীয় পণ্ডিতরা নিষিদ্ধতা বাতিল করেছে। মূলত খ্রিষ্টানরা ইয়াহুদীদের চক্রান্তে পা দিয়ে সুদে জড়িয়ে গেছে। এখন পশ্চিমা বিশ্বের অধিকাংশ লোকের কাছে উন্নত জীবন যাপনের যাবতীয় সকল সামগ্রি রয়েছে কারন তাদের জন্য ব্যাংক লোন নেয়া খুব সহজ। গাড়ি, বাড়ি, উচ্চ ডিগ্রি, স্মার্ট ফোন, গেজেট সবকিছুতেই লোন মিলে খুব সহজে। কিন্তু তারা সব কিছু ভোগ করতে পারলেও সত্যিকারের মালিকানা তাদের নেই। এই সব লোন বস্তুগত ইচ্ছা পূরণ করলেও মানুষকে সত্যিকারের সুখ দিতে পারেনি। তাই তো তারা হতাশা, নিরাশা, দুর্দশা ও একাকীত্বে ভোগে। চ্যালেঞ্জ করে বলছি, যারা সুদ সহ হারামে জড়িয়ে আছেন, তারা অন্তর থেকে চিন্তা করে বলুন তো আপনারা কি এই হতাশা, একাকীত্ব রোগে ভুগছেন না? দুনিয়াকে আপনি দেখাচ্ছেন আপনি সুখি, কিন্তু এটা কি শুধু অভিনয় নয়? আল্লাহ পবিত্র কুর’আনে বলেছেন- “(পার্থিব ভোগ সামগ্রীতে) একে অন্যের উপর আধিক্য লাভের প্রচেষ্টা তোমাদেরকে গাফেল করে রাখে। যতক্ষণ না তোমরা কবরস্থানে পৌছে যাও।” (সূরা তাকাছুরঃ ১-২) অর্থাৎ কবরে পৌঁছানোর আগপর্যন্ত প্রাচুর্যের ক্ষুধা গাফেল করে রাখে।
যাহোক, জীবনটাকে এমন ভাবে সাজানো হয়েছে যে একজনকে যাবতীয় সামগ্রি ভোগের পাশাপাশি দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত তার জীবনের পুরো সময় ও পরিশ্রম ঋণের টাকা পরিশোধ করতে লেগে যায়। জীবনের এখন একটি উদ্দেশ্য হয়ে গেছে- আমার বাড়ি, গাড়ি, স্মার্ট- ফোন, উচ্চ শিক্ষা, বিলাসবুহুল জীবন ইত্যাদি পেতে হবে এবং লোন চুকাতে হবে তাই চাই পরিশ্রম। আর এভাবে নিজেকে ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে ভাবার সময় নেই। নিজের ব্যক্তিসত্তার বাহিরে বের হতেই পারে না তারা। দুনিয়া কেন বানানো হয়েছে? কেন আমরা দুনিয়ায় এসেছি? মৃত্যু কি আমাদের পাকরাও করবে না? ইত্যাদি নিয়ে চিন্তার সময় ও সুযোগ নেই। বস্তুবাদী দুনিয়ায় তারা নিজেদের অস্তিত্বকেই একটি বস্তুতে পরিনত করেছে। আর এই জীবনে সুখ বলতে কি আছে তা আসলে কেউ বুঝতে পারে না।
হাদিসে আছে শেষ জামানায় সবাই সুদে জড়াবে যে জড়াবে না সুদের ছিটা তাকেও গ্রাস করবে। তাই সন্দেহজনক এমন সকল কিছু থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে হবে। সুদ ও ব্যাংক থেকে তো বাঁচতেই হবে সাথে সাথে ইসলামিক ব্যাংকিং সিস্টেম বা কোন ব্যাংকের দারোয়ান, ড্রাইভার অথবা ব্যাংকের এমন কোন ডিপার্টমেন্ট যেটা সুদের সাথে জড়িত নয় ইত্যাদির সাথে যুক্ত হওয়া থেকেও বেঁচে থাকতে হবে। আর একদম না পারলে কমপক্ষে হারামকে হারাম বলে বিশ্বাস করতে হবে। কোন ভাবেই সেটাকে হালাল বানানোর স্কোপ খোঁজা যাবে না। প্রতিনিয়ত হারাম থেকে বেঁচে থাকার দুয়া করতে হবে।
হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যে সমস্ত পাওনা আছে, তা পরিত্যাগ কর, যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাক। অতঃপর যদি তোমরা পরিত্যাগ না কর, তবে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত হয়ে যাও। কিন্তু যদি তোমরা তওবা কর, তবে তোমরা নিজের মূলধন পেয়ে যাবে। তোমরা কারও প্রতি অত্যাচার করো না এবং কেউ তোমাদের প্রতি অত্যাচার করবে না। (সুরা বাকারা ২৭৮-২৭৯)
হে আল্লাহ! আমাদের ছোট-বড় ও সন্দেহজনক সকল ধরনের সুদ থেকে দূরে রাখুন। আমিন ইয়া রাব্বাল আলামিন।
(এই নোট হল সুদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ের আমার লেখা পোস্ট গুলোর সংকলন। একটি স্মারক বইতে প্রকাশের জন্য প্রবন্ধটি সংকলন ও পরিমার্জন করা হয়েছিল। সম্পাদক মশাই এই লেখা দেখে বলেছিলেন, “একটু শক্ত হয়ে গেল না?” আমি বলেছিলাম, “আমার হিসেবে এটা নরম, সুদ নিয়ে আরো শক্ত লেখা উচিত ছিল। আর প্রকাশ করার পূর্বে শর্ত হল, লেখাটি হুবহু ছাপাতে হবে কোনো এডিট করতে পারবেন না।” পরে এডিট না করেই ছাপানো হয়েছিল)
No comments